কিভাবে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবেন?

আপনি আপনার চারপাশে এমন একজনকে চিনে থাকবেন যে সচরাচর খুব একটা অসুস্থ্য হয়না। হতে পারে সে অফিসের কেউ, যে কোন না কোন ভাবে সিজনাল জ্বর, ফ্লু, সর্দি প্রভৃত্তি ব্যাধি থেকে বারবার বেঁচে যায়। পুরো অফিস কিংবা তার পুরো পরিবার যখন ঠান্ডা/জ্বর ব্যাধিতে আক্রান্ত তখনও সে থাকে দিব্যি সুস্থ্য। কিন্তু, সে কিভাবে এরকম সুস্থ্য থাকে? সে কি সুপার হিউম্যান? একদমই না! এর মূলে রয়েছে তার শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যাকে ইংরেজিতে বলা হয় Immune System. জানা-অজানার এই পর্বে আমরা জানবো ইমিউন সিস্টেম কী এবং কিভাবে এই সিস্টেমকে শক্তিশালী করা যায় সে ব্যাপারে। এর আগে যদি আমাদের চ্যানেলটি আপনার সাবস্ক্রাইব করা না থাকে তাহলে এখনই সাবস্ক্রাইব করে নিন আর নিত্য নতুন ভিডিওর আপডেট পেতে বেল আইকনে ক্লিক করুন।

ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা মানবদেহে একটি নিরাপত্তা সিস্টেম স্বরূপ। এই সিস্টেম আপনার শরীরের জন্য ক্ষতিকর পদার্থ যেমন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এবং রাসায়নিক উপাদান প্রবেশ এবং রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে দূরে রাখে। ইমিউনিটি দেহ প্রতিরক্ষার জন্য একটি প্রাকৃতিক উপায়। একটি শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি কমিয়ে দিয়ে রোগ নিরাময় ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

এই ইমিউন সিস্টেম তথা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অনেকগুলো পদ্ধতি রয়েছে। যেগুলো মেনে চললে অনেকরকম রোগ-বালাই থেকে মুক্ত থাকা যায়। আমাদের প্রত্যেকের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সতন্ত্র। অনেক ভাবেই আপনি আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে নিতে পারেন। ব্যাপারটা ম্যাজিকের মতো শোনালো বোধহয়, কিন্তু সত্যটা হচ্ছে এর অধিকাংশ ট্রিকসই খুবই সিম্পল। স্বস্তির কথা হচ্ছে অধিকাংশ ট্রিকসেই আপনার লাইফস্টাইলে তেমন কোন পরিবর্তন প্রয়োজন হবে না।

চলুন প্রোটিন দিয়ে শুরু করি। প্রোটিন শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা বাড়ায়, রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শক্তি জোগায়। প্রোটিন শুধুমাত্র দেহের ইমিউন সেল গঠন নয় বরং শরীরের সকল সেলে গঠনে মূল ভূমিকা পালন করে। দেহের ইমিউন সেলের জন্য প্রোটিন একপ্রকার এ্যামিনো এসিড সরবরাহ করে যেটাকে এল-আর্জিনাইন বলে। ফ্লু আক্রান্ত রোগী এবং সাধারণ মানুষের উপর এক পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যাদের মারাত্মক আগুনো পোড়া ঘা রয়েছে তাদের এল-আর্জিনাইন, উপকারী টি-সেল গঠনে সাহায্য করে। এটি হলো এমন একটি সেল যা দেহের বাকী ইমিউন সিস্টেমের মধ্যে ভাইরাসের মতো দেখতে জিনিসগুলোতে শো করে , যাতে করে এটি সেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে স্পেসিফিক সেল তৈরি করতে পারে।  

আপনার খাদ্যতালিকার কিছু নির্দিষ্ট খাবার আপনার ইমিউন সিস্টেমকে টিপ-টপ কন্ডিশনে রাখতে সাহায্য করে। কিছু হার্বস যেমন হলুদ, পুদিনা পাতা, গোলমরিচ প্রভৃত্তি দীর্ঘকাল যাবত এদের ঔষধি গুনের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়াও অন্যান্য খাবার যেমনঃ মাশরুম, আদা এগুলোও সু-স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে। মাশরুমে আছে এন্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান যা দ্রুততর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়। রসুনও শরীরে অনেক উপকার করে যা শতাব্দী ধরে নিবারক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আদা একটি আয়ুর্বেদিক ঔষধ, যা শরীরকে রাখে উষ্ণ এবং ক্ষতিকর টক্সিন দেহে জমতে বাধা দেয়। বিশেষ করে ফুসফুস এবং সাইনাসের ক্ষতি হতে দেয় না আদা। আর রসুন কাঁচা খেতে পারলে তা খুবই উপকারি। ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস দূর করতে সাহায্য করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর এই মশলাটি।

মানসিক চাপ কমানোর মাধ্যমেও সার্বিকভাবে ইমিউন ফাংশনকে বুস্ট আপ করা যায়। এক স্টাডিতে দেখা গেছে আনন্দময় কোন উৎসবে অংশ নিলে এন্ডোর্ফিন এবং অন্যান্য হরমোন বেড়ে যায়, যা শরীরে শিথীলতা আনতে সাহায্য করে। দীর্ঘ মেয়াদী মানসিক চাপ ইমিউন সিস্টেমকে বাধাগ্রস্থ করে এবং রোগের বিরুদ্ধে এর প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দূর্বল করে দেয়। অতিরিক্ত মানসিক চাপে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে ফেলে। তাই মানসিক চাপমুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে। টিভি, সোশ্যাল মিডিয়ায় যে খবরগুলো আপনাকে মানসিক চাপে ফেলছে, সেগুলো থেকে দূরে থাকুন। পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে ভালো সময় কাটান, গান শুনুন, বই পড়ুন, মুভি দেখুন বা নতুন কিছু শিখতে মনোনিবেশ করুন। মেডিটেশন একটি খুব ভালো উপায় মনকে শান্ত রাখার।

ঘুম ইমিউন সিস্টেমকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। কিছু স্টাডিতে দেখা গেছে যখন কেউ অসুস্থ্য থাকে তখন ঘুম কিছু নির্দিষ্ট ইমিউন সেল লিম্ফ নোডে বন্টন করে, যেখানে সেগুলো সংক্রমনের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এছাড়াও ঘুম শরীরের রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সঠিক ইমিউন সেল গঠনে মূল ভূমিকা পালন করে। ঘুমের সময় আপনার দেহ সাইটোকাইনস তৈরি করে। সাইটোকাইনস এমন প্রোটিন যা সংক্রমণ কমাতে সহায়তা করে।

অ্যালকোহল পান থেকে বিরত থাকুন
অ্যালকোহল পান করার ফলে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম এবং ইমিউন সিস্টেমের মাঝে যোগাযোগ ব্যাহত হয়। অ্যালকোহল অন্ত্রের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করে। এছাড়াও, সিগারেটের ধোঁয়া ধূমপায়ীদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাটিকে দুর্বল করে তোলে। আমাদের শরীরের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টগুলোর (যেমন ভিটামিন সি) ওপর ধূমপানের প্রভাব আছে, যা শরীরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। যে কোনো ধরনের ধূমপান আমাদের শ্বাসনালীর টিস্যুগুলোর জন্য সরাসরি ক্ষতিকর। এই দুটি অভ্যাস পরিত্যাগের মাধ্যমেও ইমিউন সিস্টেমকে বুস্ট-আপ করা যায়।

যদি ইউমিউন সিটেমকে বুস্ট-আপ করতে অন্য আরেকটি পদ্ধতি জানতে তো সেটি হচ্ছে আপনাকে ব্যায়াম করতে হবে। এই ধরুনঃ হাটাহাটি কিংবা দৌড়ো দৌড়ি। পরিমিত ব্যায়াম আপনার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করে। নিয়মিত ও পরিমিত ব্যায়াম প্রদাহজনক প্রতিক্রিয়া হ্রাস করে এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি অ্যান্টিবডি এবং শ্বেত রক্ত কণিকাকে আরও দ্রুত সঞ্চালনে সহায়তা করে। ব্যায়াম স্ট্রেস হরমোন হ্রাস করে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ব্যায়ামের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অস্থায়ী তাপমাত্রার বৃদ্ধি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসকে দুর্বল বা হত্যা করতে পারে। আপনি নিয়মিত যত বেশি ব্যায়াম করবেন এই প্রতিরোধ ক্ষমতা ততো বৃদ্ধি পাবে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে ৫-৬ দিন হালকা ব্যায়াম করে তারা যারা ব্যায়াম করেনা তাদের তুলনায় অর্ধেক ঠান্ডা ও গলা ব্যাথায় আক্রান্ত হয়।

যদি এসবের কোনটাই আপনি করতে না পারেন তাহলে অন্তত একটু ঘনঘন বাইরে বের হবার অভ্যাস গড়ে তুলুন। সূর্যের আলোয় বাইরে বের হলে তা আপনার ইমিউন সিস্টেমকে সাহায্য করবে। গবেষকগণের মতে, সূর্যের আলো রোগ প্রতিরোধকারী টি-সেলকে শক্তিশালী করে যা ইমিউন সিস্টেমের মুখ্য অংশ। সূর্যের আলোয় থাকা ভিটামিন ডি-এর স্বল্পতা আপনার অভিযোজক প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল করে ফেলে। এটি অটো ইমিউন সিস্টেমের অংশ, যা নিজস্ব ভ্যাকসিনেশনের পেছনে কাজ করে।

তো, শরীরের মুভমেন্ট করুন, পরিমিত ঘুমান, স্বাস্থ্যকর ফলমূল ও শাকসবজী খান; আপনার চেনা সেই চির সুস্থ্য থাকা ব্যাক্তিটি আপনাকে জিজ্ঞেস করবে “তুমি এতো ফিট কিভাবে থাকো?”।  

Related Post

Leave a Comment